তারেকুর রহমান, কক্সবাজার
সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে প্রতিদিন তীরে ভেসে আসে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, ছেঁড়া মাছ ধরার জালসহ নানা ধরনের বর্জ্য। এতে দূষিত হয় সমুদ্রসৈকত ও উপকূলীয় পরিবেশ। দূষণ রোধের এই তাড়না থেকেই ছুটে চলেন ওরা ১০ জন। সমুদ্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করা এই দলটির নাম ‘ব্লু গার্ড’।
জানা যায়, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার উপকূলীয় বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুরে ১০ সদস্য নিয়ে কাজ করছে এই ব্লু গার্ড দল। সমুদ্র ও উপকূলীয় পরিবেশ সুরক্ষা, সামুদ্রিক দূষণ কমানো এবং মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করাই তাদের মূল কাজ। এর মধ্যে মেরিন লিটার শনাক্ত ও সংগ্রহ করা তাদের অন্যতম প্রধান কাজের অংশ। এছাড়াও সৈকতে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, পরিত্যক্ত ও ছেঁড়া মাছ ধরার জালসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য সংগ্রহ করে সরিয়ে ফেলার কাজও করেন তারা।
এ বিষয়ে ব্লু গার্ডের সদস্যরা জানান, সমুদ্রে ফেলে রাখা পরিত্যক্ত ও ছেঁড়া মাছ ধরার জাল সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। স্রোতের সঙ্গে ভেসে বেড়ানো এসব জালে মাছের পাশাপাশি কাছিম, ডলফিনসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী আটকা পড়ে আহত বা মারা যেতে পারে। দীর্ঘদিন সমুদ্রে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত জাল পরিবেশেরও ক্ষতি করে। এ কারণে সমুদ্রকে দূষণমুক্ত ও সামুদ্রিক প্রাণীদের নিরাপদ রাখতে তারা নিয়মিত সৈকত থেকে বর্জ্য ও পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল সংগ্রহ করেন।
সদস্যরা আরও জানান, সৈকত পরিষ্কারের পাশাপাশি সংগ্রহ করা বর্জ্যের ধরন, পরিমাণ ও অবস্থান সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কোন ধরনের বর্জ্য কোথায় বেশি পাওয়া যাচ্ছে, তা নথিভুক্ত করার মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় মেরিন লিটারের উপস্থিতি ও দূষণের ধরন সম্পর্কে ধারণা তৈরির চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে দূষণের উৎস চিহ্নিত করতেও এসব তথ্য কাজে লাগানো হচ্ছে। সমুদ্র ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষার তাড়না থেকেই তারা নিয়মিত এই কাজ করে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে ব্লু গার্ড সদস্য সোহেল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ১০ জন মিলে নিয়মিত সৈকত ও উপকূলীয় এলাকায় কাজ করছি। কোথাও প্লাস্টিক, পলিথিন বা পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল পড়ে থাকতে দেখলে সেগুলো সংগ্রহ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে শামলাপুরের সমুদ্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা তৈরি করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করি শুধু সৈকত পরিষ্কার করে দীর্ঘমেয়াদে সমুদ্রকে দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য স্থানীয় মানুষ, জেলে, ব্যবসায়ী, পর্যটক ও শিক্ষার্থীদের আচরণে পরিবর্তন আনাও জরুরি। সমুদ্রকে রক্ষা করতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’
সদস্য মোহাম্মদ হোছাইন বলেন, ‘আমরা জীববৈচিত্র্য রক্ষার বার্তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। আমরা শামলাপুর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে মাসিক সচেতনতামূলক সেশন আয়োজন করি। এসব সেশনে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, সমুদ্রদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব এবং পরিচ্ছন্ন উপকূলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। শামলাপুরের ১০ জনের এই উদ্যোগ উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় মানুষকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে ভূমিকা রাখতে পারে।’












