দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী অক্টোবর থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর এম. মোশাররফ হোসেন।
তিনি জানান, রানওয়ের অ্যাসফাল্ট ওভারলে, এক্সটেনশন, লাইটিংসহ সংশ্লিষ্ট সব কাজ শেষ হয়েছে। এখন বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে কক্সবাজারের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিদেশি পর্যটকদের সরাসরি কক্সবাজারে আসার সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
জানা গেছে, নতুন টার্মিনালটি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ। বিমানবন্দরটির সক্ষমতা বাড়ানো এবং দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্যের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে দুটি উন্নয়ন প্রকল্প ও একটি কারিগরি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বেবিচক।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) জানায়, প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৬ বর্গমিটার আয়তনের আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালটি প্রায় ৩৬২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা অনুমোদিত ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। টার্মিনালে ৪৫০ জন আন্তর্জাতিক যাত্রীর ধারণক্ষমতার ডিপার্চার লাউঞ্জ, শুল্কমুক্ত দোকান, বোর্ডিং ব্রিজ, লিফট, এসকেলেটর, কনভেয়ার বেল্ট, চেক-ইন ডেস্ক, বহির্গমন ও আগমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার এবং অ্যারাইভাল লাউঞ্জ রয়েছে। আন্তর্জাতিক যাত্রীদের সেবায় বহির্গমনকারী যাত্রীদের জন্য চারটি এবং আগমনকারী যাত্রীদের জন্য ছয়টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে।
আগমনকারী যাত্রীদের লাগেজ সরবরাহের জন্য রয়েছে দুটি লাগেজ ডেলিভারি বেল্ট। পাশাপাশি পাবলিক অ্যাড্রেস (পিএ) ও ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেম (এফআইডিএস), সাইনেজ, সিসিটিভি এবং ভারী হাতব্যাগ স্ক্যানিংয়ের সুবিধাও যুক্ত করা হয়েছে।
বেবিচক আরও জানায়, টার্মিনাল সম্প্রসারণের পর কক্সবাজার বিমানবন্দরের বার্ষিক যাত্রী ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার থেকে বেড়ে ১৮ লাখে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক টার্মিনালের পাশাপাশি বিমানবন্দরের অ্যাপ্রন ও ট্যাক্সিওয়ের সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। দুটি ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ এবং তিনটি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ ধারণক্ষমতার ৩৬ হাজার ৩০০ বর্গমিটারের অ্যাপ্রন ও দুটি ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৩৫টি ভিআইপি ও ৯০টি সাধারণ যানবাহনের জন্য পার্কিং সুবিধা, অভ্যন্তরীণ সড়কসহ অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামোও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় মান যাচাইয়ের পর বিমানবন্দরটি আইসিএও সনদ পেয়েছে বলেও জানিয়েছে বেবিচক।
এই কর্তৃপক্ষ জানায়, বিমানবন্দরের রূপান্তরের অন্যতম বড় কাজ হয়েছে রানওয়ে সম্প্রসারণ। ৯ হাজার ফুট থেকে রানওয়ের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে ১০ হাজার ৭০০ ফুট করা হয়েছে। ১ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ে সম্প্রসারণের জন্য বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৪৩ হেক্টর জমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এর ফলে রানওয়েটি বাংলাদেশের দীর্ঘতম রানওয়ে হয়েছে। সম্প্রসারিত রানওয়েটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ইআর ও বোয়িং ৭৪৭-৪০০সহ সম্পূর্ণ বোঝাই ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজ পরিচালনার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ৩ হাজার ৭০৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৭৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। চীনা যৌথ উদ্যোগ সিওয়াইডব্লিউইবি-সিসিইসিসি জেভি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রের দিকে সম্প্রসারিত প্রায় ২ হাজার ২০০ ফুট এলাকায় প্রিসিশন অ্যাপ্রোচ লাইটিং এবং নিরাপদ উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য ক্যাট-টু এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রানওয়েকে সুরক্ষিত রাখতে নির্মাণ করা হয়েছে ১ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ। এছাড়া নিরাপত্তা বেড়া, টহল সড়ক এবং ৮ হাজার ১৪৯ মিটার দীর্ঘ ড্রেনেজ ব্যবস্থাও প্রকল্পের আওতায় রয়েছে।
বেবিচক জানায়, বর্তমানে কক্সবাজার বাংলাদেশের ব্যস্ততম অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরগুলোর একটি। এখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ২৮ থেকে ৩০টি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ওঠানামা করে। আন্তর্জাতিক টার্মিনাল ও রানওয়ে সম্প্রসারণের ফলে বিমানবন্দরটি এখন বড় উড়োজাহাজ পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ চালু হলে কক্সবাজারে আরও বেশি বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি হোটেল, রিসোর্ট ও অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্যটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারের সরাসরি যোগাযোগ আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ.ন.ম. হেলাল উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হওয়া কক্সবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে বিদেশি পর্যটকের আগমন বাড়বে এবং পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে পর্যটকদের নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পর্যটন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।