তারেকুর রহমান, কক্সবাজার :
টাকা হাতে নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরছেন ক্রেতারা। কোথাও সিলিন্ডার নেই, আবার কোথাও মিললেও দিতে হচ্ছে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি। রান্নার গ্যাসের জন্য এমন ভোগান্তি এখন কক্সবাজার শহরের অনেক এলাকার নিত্যদিনের চিত্র। সরবরাহ সংকটের মধ্যে নতুন করে দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সরকারি নির্ধারিত দাম কার্যকর থাকলেও বাজারে তার প্রতিফলন নেই। বরং এলাকা ও ব্র্যান্ডভেদে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার।
গত দুই সপ্তাহ ধরে কক্সবাজারে এলপিজির বাজারে এ অস্থিরতা চলছে বলে জানিয়েছেন ভোক্তা ও ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে রোববার (৪ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টায় ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সেপ্টেম্বরে এই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর বাজারে সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। কক্সবাজার শহরের পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন স্থানে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কোথাও বাড়তি দাম দিয়েও মিলছে সীমিত পরিমাণে।
সরেজমিনে গিয়ে শহরের বাহারছড়া, নুনিয়াছড়া, কলাতলী, আলীর জাহাল, জেল গেট, পেশকার পাড়া, নুর পাড়া ও বাস টার্মিনাল এলাকায় খোঁজ নিয়ে বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রি এবং অনেক ক্ষেত্রে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
টেকপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাসেম উদ্দিন বলেন, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ১২ কেজির একটি এআই সিলিন্ডার কিনেছেন ২ হাজার ১০০ টাকায়। অথচ এক মাস আগেও একই গ্যাস ১ হাজার ৬৫০ টাকায় কিনেছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘একদিকে গ্যাসের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ ভোক্তারাই এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
রুমালিয়ারছরা এলাকার বাসিন্দা হান্নান শাহ বলেন, গত দুইদিন আগে ২ হাজার টাকা দিয়ে ওমেরা গ্যাস কিনেছেন। সরকার দাম নির্ধারণ করলেও কার্যকর নজরদারি না থাকায় আমাদের কাছ থেকে বিক্রেতারা অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন।
কলাতলী এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী সাইফুল আলম বলেন, বাজারে প্রকাশ্যেই বাড়তি দামে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে। অথচ অনিয়মের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। এতে একদিকে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে।
বাজারে শুধু দাম বাড়ার অভিযোগ নয়, অনেক দোকানে সিলিন্ডার না থাকার কথাও জানিয়েছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।
শহরের কালুর দোকান শাহীন ট্রেডার্স এর স্বত্তাধিকারী সরওয়ার শাহীন বলেন, সরবরাহ সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। তার দোকানে চার কোম্পানির সিলিন্ডার রয়েছে। এর মধ্যে বেক্সিমকোর ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ১০০ টাকা এবং আই গ্যাস, যমুনা ও ওমেরা ২ হাজার ৫০ টাকা দামে বিক্রি করছেন।
বাড়তি দামের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সরকারি এলপি গ্যাস তো বাজারেই নেই। দুই-একটি কোম্পানির গ্যাস পাওয়া গেলেও চাহিদার তুলনায় তা খুবই কম।’
বাহারছড়া এলাকার সালাহউদ্দিন নামের এক খুচরা গ্যাস ব্যবসায়ী জানান, তার কাছে এসিআই ও ফ্রেশ ব্র্যান্ডের ১২ কেজির সিলিন্ডার ছিল। সেগুলো বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে কোনো গ্যাস পাননি। ফলে ক্রেতারা দোকানে এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির অভিযোগ, গত ২০ সেপ্টেম্বরের পর আমদানিকারকরা সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। ২৫ সেপ্টেম্বরের পর কয়েকটি ডিপো থেকেও সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি তাদের।
জেলা এলপিজি সমিতির সভাপতি সরওয়ার আলম বলেন, ‘সরকার দাম নির্ধারণ করলেও কোম্পানিগুলো ওই দামে ডিলারদের গ্যাস দিচ্ছে না। কোম্পানি পর্যায় থেকেই ডিলারদের বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘গ্যাস কেনার কোনো ভাউচার কোম্পানিগুলো দিচ্ছে না। বেশি দামে কিনে ভাউচার না পাওয়ায় ডিলাররা ভাউচার ছাড়াই গ্যাস বিক্রি করছেন।’
অন্যান্য ব্যবসায়ীরা বলেন, সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শুধু সরকারি দামের ঘোষণা দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। কারণ ডিলার পর্যায়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে হলে খুচরা পর্যায়েও তার প্রভাব পড়ছে।
এলপিজির বাজারে অনিয়মের অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। বেশি দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগে জেল রোডের ওসানিক ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক হাসান-আল-মারুফ বলেন, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও বাজার তদারকির পাশাপাশি অভিযানও চালানো হচ্ছে। এলপিজি সরবরাহকারীদের ওপর তদারকি বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গত সপ্তাহে জেল রোডের একটি প্রতিষ্ঠানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছি।’
তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে জরিমানা করলেও সামগ্রিক বাজারে এর প্রভাব খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। নির্ধারিত দামের চেয়ে বাড়তি টাকা নেওয়া এবং সিলিন্ডার না পাওয়ার সমস্যা এখনো রয়েছে।
এলপিজির সরবরাহ সংকটের প্রভাব শুধু বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় সীমাবদ্ধ নেই; পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়েছে।
পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগে গত রবিবার (৪ অক্টোবর) কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লিংক রোড এলাকায় সিএনজি চালকরা প্রায় দুই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন। পরে প্রশাসন ও পুলিশের আশ্বাসে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
চালকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় গাড়ি চালানো ও আয়-রোজগার দুটোই ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে পরিবহন ব্যবস্থাতেও।
কক্সবাজারে পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে এলপিজির ব্যবহার ব্যাপক। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গেলে এর প্রভাব সরাসরি পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর।
বর্তমানে একদিকে বিইআরসির নতুন নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা, অন্যদিকে বাজারে ১২ কেজির বিভিন্ন কোম্পানির সিলিন্ডার ২ হাজার টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ৪০০ টাকা বেশি দিয়েও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
ভোক্তাদের প্রশ্ন সরকার দাম নির্ধারণ করলেও যদি সেই দামে পণ্য না মেলে, তাহলে সেই মূল্য নির্ধারণের সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাচ্ছেন?
Related
আরও পড়ুন:
সরকারি নিবন্ধন পেল সেচ্ছাসেবী সংগঠন “মানবিক টিম কুতুবদিয়া”
সেন্টমার্টিন দ্বীপে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটক নিয়ন্ত্রণে কমিটি
সাফজয়ী ঋতুপর্ণার ক্যান্সার আক্রান্ত মায়ের পাশে তারেক রহমান
ক্রিকেট ব্যাটে বিশেষ কায়দায় ইয়াবা পাচার: কক্সবাজার বিমানবন্দরে আটক ২
কক্সবাজারে বাবাকে হত্যার পর পুঁতে ফেলা ছেলে গ্রেপ্তার
ওসমান হাদির মৃত্যুতে উপহাস ও ‘জঙ্গি’ ট্যাগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার
রামুতে অস্ত্র তৈরির গোপন কারখানা, বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম উদ্ধার
টেকনাফ সৈকত থেকে তরুণ-তরুণীর মরদেহ উদ্ধার
কক্সবাজার সৈকতে এক সপ্তাহের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
কক্সবাজারে বিভিন্ন অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তার ১৪
মহেশখালীতে কোস্ট গার্ডের অভিযানে অস্ত্র-গোলাবারুদসহ ‘মিন্টু বাহিনীর’ প্রধান আটক
কক্সবাজার বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক টার্মিনালের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু
