জানা ছিলো না আগাম বার্তা, তাই ভাসলো স্বপ্ন, সংসার-সহায়-সম্বল

কক্সবাজার কুতুবদিয়া চকরিয়া টেকনাফ পেকুয়া

তারেকুর রহমান, কক্সবাজার 

মাত্র কয়েক মাস আগে মৃত্যুর কাছে হার মেনেছেন জীবনসঙ্গিনী। স্ত্রীর চলে যাওয়ার শোক বুকে নিয়ে চার সন্তানকে আঁকড়ে ধরে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিলেন মোহাম্মদ রাসেল (৪০)। কিন্তু সেই স্বপ্নও টিকল না। কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ আর মাতামুহুরী নদীর ভয়াল ঢলে মুহূর্তেই তছনছ হয়ে গেল তার পুরো সংসার। চোখের সামনে ভেসে গেল ঘরের আসবাবপত্র, সন্তানদের বই-খাতা, বছরের পর বছর ধরে কষ্টে গড়ে তোলা শেষ সম্বল।

কক্সবাজারের চকরিয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কোচপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল প্রায় দুই যুগ ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন মাতামুহুরী নদীতীরের ওই এলাকায়। পরিবারের সদস্য ছয়জন। দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে কোনো রকমে চলছিল তার সংসার। বড় ছেলে জিয়াউর রহমান রাকিব সম্প্রতি এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। অন্য সন্তানরাও বিদ্যালয়ে পড়ে। কিন্তু এবারের বন্যা তাদের সবকিছু পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।

রাসেল জানান, ৮ জুলাই রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ করেই পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। হঠাৎ পেছন দিক থেকে মাতামুহুরী নদীর পানি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততায় ঘরের কোনো মালামাল বের করার সুযোগই পাননি।

কান্নার কণ্ঠে তিনি বলেন, “স্ত্রী মারা যাওয়ার পর চারটা সন্তানকে নিয়া অনেক কষ্টে সংসার চালাচ্ছি। ভাবছিলাম, ধীরে ধীরে আবার সব গুছিয়ে নেব। কিন্তু এই বন্যা আমার শেষ সম্বলটাও কেড়ে নিল। ঘরের খাট, আলমারি, কাপড়চোপড়, চাল-ডাল, বাচ্চাদের বই-খাতা কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। এখন সন্তানদের নিয়া কোথায় যাব, কী খাওয়াব, কেমনে আবার ঘর তৈরি করব কিছুই বুঝছি না।”

রাসেলের স্ত্রী নূর নাহার মারা গেছেন ১১ মাস আগে। স্ত্রীকে হারানোর পর সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে আবারও জীবন গোছানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু এবারের বন্যা সেই চেষ্টাকেও ধূলিসাৎ করে দিয়েছে বলে জানান তিনি।

গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে ঘরে ঢুকে দেখা যায়, কাদায় ঢেকে আছে মেঝে। এলোমেলো পড়ে আছে খাট, ঘরের আসবাবপত্র। ভেজা কাপড়ের স্তূপের পাশে ছড়িয়ে আছে শিশুদের বই-খাতা। অনেক বইয়ের পৃষ্ঠা একে অপরের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। কোথাও শুকানোর জায়গা নেই। কাদা আর পচা পানির গন্ধে ভারী হয়ে আছে পুরো ঘর।

রাসেলের বড় ছেলে জিয়াউর রহমান রাকিব বলে, “আমি এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। সামনে কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বন্যার সব শেষ করে দিল। এখন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারব কি না জানি না। আমরা শুধু চাই আবার একটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে।”

আরেক প্রতিবেশী ছফুরা খাতুন বলেন, “এমন বন্যা আমরা অনেক বছরেও দেখি নাই। রাতের মধ্যে হঠাৎ পানি এত দ্রুত বাড়ছে যে কিছুই সরানোর সুযোগ পাইনি। আগে থেকে এমন পরিস্থিতির কোনো আগাম খবর বা সতর্কবার্তা আমাদের কাছে ছিল না। জানলে অন্তত ঘরের কিছু মালামাল ও জরুরি জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে পারতাম। রাসেলের মতো আমাদেরও অনেক ক্ষতি হয়েছে।”

এলাকার সমাজনেতা আজিজুর রহমান বলেন, “এবারের বন্যায় অনেক পরিবার রাতারাতি সর্বস্ব হারিয়েছে। আগাম নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা মানুষের কাছে পৌঁছালে অনেকেই ঘরের মালামাল, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, শুকনো খাবার ও গবাদিপশু নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে পারতেন এবং পরিবারের সদস্যদের আগেভাগেই আশ্রয়কেন্দ্র বা নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে পারতেন। এতে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো। তাই সময়মতো পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা এবং পরিবারভিত্তিক আগাম প্রস্তুতি নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি।”

স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে ওই এলাকার নদীপাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো আত্মীয়ের বাড়িতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, ওষুধপত্র এবং ঘর মেরামতের সহায়তা এখন তাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

শুধু মোহাম্মদ রাসেল নন, কোচপাড়া এলাকার  অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবার এবারের বন্যা ও মাতামুহুরী নদীর ভাঙনে একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেখা যায়, কারও ঘর আংশিক ভেঙে গেছে, কারও বসতঘর নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে। অনেকেই ঘরের আসবাবপত্র, খাদ্যসামগ্রী ও সন্তানদের বই-খাতা রক্ষা করতে পারেননি। পানি নেমে গেলেও কাদায় ঢেকে থাকা ঘর আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম শুরু হয়েছে তাদের।

নদীতীর ঘুরে দেখা যায়, কোথাও বাঁশের খুঁটি দিয়ে হেলে পড়া ঘর ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে, কোথাও ভাঙনের আতঙ্কে পরিবারগুলো নিজেরাই টিন, কাঠ ও দরজার পাল্লা খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। যেসব পরিবার বন্যার সময় কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল, তাদের অনেকেই এখন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি, আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা খোলা আকাশের নিচে অস্থায়ীভাবে দিন কাটাচ্ছেন। শিশুদের বই-খাতা, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, শিক্ষাসনদ, কাপড়চোপড়, বিছানাপত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কাদা আর পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে।

কক্সবাজারে কেন বাড়ছে বন্যার ঝুঁকি:

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কক্সবাজারে স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢলের ঘটনা আগের তুলনায় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে মাতামুহুরী ও বাঁকখালীসহ জেলার বিভিন্ন নদীর পানি অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের মানুষ পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ না পেয়েই বন্যার কবলে পড়ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতেও এ ধরনের আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, “এবারের বন্যায় অস্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিপাত হওয়ায় খাল, ড্রেন ও স্লুইস গেটের পানি ধারণক্ষমতা অতিক্রম করে যায়। অনেক স্থানে খাল ও স্লুইস গেটের মুখে অবৈধ ঘের এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা থাকায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হয়নি, যা বন্যার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।”

বন্যার পূর্বাভাস জানা জরুরি:

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষা মৌসুমে স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেড়েছে। এর সঙ্গে পাহাড়ি ঢল যুক্ত হলে কক্সবাজারের নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা অনুসরণ করে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, “পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ সচল থাকলে আকস্মিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কিন্তু খাল-নালা দখল, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বাধাগ্রস্ত হলে বন্যার ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়ে যায়। তাই প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং জলাবদ্ধতার কারণগুলো দূর করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করা সময়ের দাবি।”

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, “বন্যাকবলিত এলাকাগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা করে পর্যায়ক্রমে সরকারি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “তাৎক্ষণিক ত্রাণের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।” পাশাপাশি সবাইকে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করে আগাম সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ.ন.ম হেলাল উদ্দিন বলেন, “দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবারভিত্তিক প্রস্তুতি, আগাম সতর্কবার্তা অনুসরণ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে সমন্বয় থাকলে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। আগাম বন্যার পূর্বাভাস পেলেই পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ মালামাল উঁচু স্থানে রাখা, গবাদিপশু নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। এতে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।”

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, এ দুর্যোগে জেলার ৪৫ হাজার ৪৩৬টি পরিবারের ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মোট ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা ও ১৮ জন স্থানীয় বাসিন্দা। আহত হয়েছেন ২৪ জন। তাদের মধ্যে ৫জন রোহিঙ্গা ও ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া উপজেলা। এই উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১১ হাজার ২৩১টি পরিবারের প্রায় ৭৫ হাজার ৫০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে ৭জন নিহত ও ১ জন আহত হয়েছেন। এ উপজেলায় ৯৫ মেট্রিক টন চাল ও ২০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।