কক্সবাজার প্রতিনিধি :
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঐতিহাসিকভাবে দায়ী দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও জনগোষ্ঠীর ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেছেন, জলবায়ু অভিযোজনের নামে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে নতুন করে ঋণের বোঝায় ফেলা যাবে না।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকাল ৯টায় কক্সবাজারের পেকুয়ায় আয়োজিত মানববন্ধন ও পদযাত্রা থেকে এসব দাবি জানানো হয়।
‘জলবায়ু ক্ষতিপূরণ চাই, ঋণ নয়—এখনই ক্ষতিপূরণ চাই’ এবং ‘জলবায়ু অভিযোজনের নামে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলা চলবে না’ স্লোগানে পেকুয়া চৌমুহনী-সাবমেরিন নৌঘাঁটি সড়কে এ কর্মসূচি পালিত হয়। পরিবেশবাদী সংগঠন ধরা (পৃথিবী রক্ষায় আমরা) ও স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাকে সামনে রেখে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। বৈশ্বিক অর্থনীতি কার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে—এ প্রশ্নকে সামনে রেখে আয়োজকেরা জলবায়ু ন্যায্যতা ও ক্ষতিপূরণের দাবি তুলে ধরেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, কয়েক দশক ধরে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে শিল্পোন্নত দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে। এর সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন কৃষক, জেলে, লবণচাষি, উপকূলীয় জনগোষ্ঠী ও শ্রমজীবী মানুষ।
তারা বলেন, প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বন্যা, লবণাক্ততা, খরা ও ফসলহানিতে মানুষের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবিকার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বারবার দুর্যোগের আঘাতে অনেক পরিবার ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা হারাচ্ছে। এর মধ্যেই অভিযোজন, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে একদিকে মানুষ দুর্যোগে সম্পদ ও জীবিকা হারাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে ঋণের বোঝা। এটি জলবায়ু ন্যায্যতার পরিপন্থী।

বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষিজমি ও মানুষের জীবিকা ক্রমেই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বন্যা ও লবণাক্ততার হুমকিতে পড়ছে। জেলে, লবণচাষি, কৃষক ও দিনমজুরদের পক্ষে বারবার ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কঠিন হয়ে উঠছে।
এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু অভিযোজনের উদ্যোগ শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন ও জীবিকা পুনর্গঠন, নিরাপদ আবাসন, খাদ্য ও সুপেয় পানির নিশ্চয়তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বক্তারা বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন হতে হবে অনুদানভিত্তিক, ঋয়নির্ভর নয়। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি থেকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানিব্যবস্থায় ন্যায়সংগত উত্তরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু ন্যায্যতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মালিকানা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধন ও পদযাত্রায় বক্তব্য দেন ধরা’র পেকুয়া উপজেলা সমন্বয়ক ও পরিবেশকর্মী দেলোয়ার হোসাইন, পেকুয়া সেন্ট্রাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মুজিবুল হক চৌধুরী এবং নূর আয়েশা খান ফাউন্ডেশনের সভাপতি এম. আমজাদ হোসাইন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন নূর আয়েশা খান ফাউন্ডেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক তারেক নাজেরী, ফাউন্ডেশনটির নির্বাহী সদস্য সাইফুল নাজেরী, স্বপ্নছোঁয়া ফাউন্ডেশনের ত্রাণ, মানবিক সেবা ও প্রচারবিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত তামিম ইকবাল এবং কোস্টাল মুক্তা রোভার স্কাউটস গ্রুপের সহকারী দলনেতা জান্নাতুল মাওয়াস। এ ছাড়া বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
কর্মসূচির আয়োজকেরা বলেন, জলবায়ু সংকটের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য দায় নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে বিপর্যস্ত দেশগুলোর জন্য অবিলম্বে ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়সংগত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রয়োজন নতুন ঋণ নয়, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও অনুদান।












