কক্সবাজারে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট; দুর্গম এলাকায় এখনো পৌঁছেনি ত্রাণ

কক্সবাজার

তারেকুর রহমান, কক্সবাজার :

টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী নদী তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। পানি কিছুটা কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ এখনো পানিবন্দি। বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, খাবারের অভাব এবং দুর্গম এলাকায় ত্রাণ না পৌঁছানোয় মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
{“remix_data”:[],”remix_entry_point”:”challenges”,”source_tags”:[],”origin”:”unknown”,”total_draw_time”:0,”total_draw_actions”:0,”layers_used”:0,”brushes_used”:0,”photos_added”:0,”total_editor_actions”:{},”tools_used”:{},”is_sticker”:false,”edited_since_last_sticker_save”:false,”containsFTESticker”:false}
রবিবার (১২ জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বন্যার পানিতে নলকূপ তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানির উৎস প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বন্যার পানি ব্যবহার করছে। অন্যদিকে বাজার, সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চাল, ডাল, শিশুখাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার গবাদিপশু ও সামান্য সহায়-সম্বল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু স্থান কিংবা ঘরের মাচায়। বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে নৌকাই এখন যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম।
দেখা গেছে, বৈরি আবহাওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় দুর্গত এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় সম্পূর্ণ থমকে গেছে। অনেক পরিবারের ঘরে এখনো হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি থাকায় রাতে নিরাপদে ঘুমানোর জায়গা নেই। কেউ ঘরের মাচায়, কেউ উঁচু খাটে, আবার কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে গাদাগাদি করে দিনরাত কাটাচ্ছেন। পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশ পরিবারের রান্নার চুলা অচল হয়ে পড়েছে। শুকনো জ্বালানি না থাকায় অনেকেই রান্না করতে পারছেন না। ফলে শুকনো খাবার বা যা পাওয়া যাচ্ছে তাই খেয়ে দিন পার করছেন।
এদিকে পানির নিচে তলিয়ে গেছে অনেক শৌচাগারও। এতে নারী, শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন সুবিধা না থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারছেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা না গেলে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চকরিয়া উপজেলার কাকারা, বরইতলী, রসুলাবাদ, হারবাং ও বিবিরখীল এলাকার অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বন্যার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের এলাকায় এখনো কোনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছেনি।
লক্ষ্যারচর এলাকার শামশুল আলম বলেন, “ঘরে এখনো পানি। রাতে ঠিকমতো ঘুমানোর জায়গা নেই, মাচায় কোনোমতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকছি। চুলা জ্বালাতে না পারায় কয়েক দিন ধরে রান্না করতে পারিনি। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানিরও সংকট। শৌচাগারও পানির নিচে থাকায় খুব কষ্টে দিন কাটছে। ঘরে যা খাবার ছিল সব শেষ। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি আর দ্রুত ত্রাণ।”
বরইতলীর বাসিন্দা মোহাম্মদ আলম বলেন, “ঘরে যা খাবার ছিল সব শেষ। বাজারে যেতে পারছি না। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন খাবার আর বিশুদ্ধ পানি।”
হারবাংয়ের রোকেয়া বেগম বলেন, “নলকূপ ডুবে গেছে। বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছি না। বাচ্চাদের নিয়ে খুব ভয় লাগছে। সবাই ত্রাণের কথা বলছে, কিন্তু আমাদের এলাকায় এখনো কেউ আসেনি।”
কাকারা ইউনিয়নের আবদুল কাদের বলেন, “নৌকা ছাড়া বের হওয়ার উপায় নেই। কয়েক দিন ধরে অর্ধাহারে দিন কাটছে। দ্রুত ত্রাণ না এলে আরও বড় বিপদ হবে।”
বিবিরখীলের নুরুল আমিন বলেন, “বাড়িতে রান্না করার মতো কিছু নেই। পানিবন্দি হয়ে আছি। প্রশাসনের কাছে দ্রুত ত্রাণ ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানাই।”
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষার্থীরাও। অনেকের বই-খাতা, স্কুলব্যাগ ও শিক্ষা উপকরণ পানিতে ভেসে গেছে।
রসুলাবাদের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলে, “আমার সব বই-খাতা নষ্ট হয়ে গেছে। সামনে পরীক্ষা। এখন কীভাবে পড়াশোনা করব বুঝতে পারছি না।”
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলে, “স্কুলব্যাগ, বই-খাতা সব ভেসে গেছে। নতুন করে কেনার সামর্থ্য আমাদের নেই।”
স্থানীয়দের মতে, শুধু অতিবৃষ্টিই নয়, দীর্ঘদিন ধরে মাতামুহুরী নদী ও এর শাখা নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়া, অবৈধ দখল এবং পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
কক্সবাজার পরিবেশ ও বন সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, “মাতামুহুরী নদী খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে প্রতিবছরই এ ধরনের দুর্যোগ আরও ভয়াবহ হবে। শুধু ত্রাণ নয়, স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে স্লুইসগেট ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও দায়ী। কিছু স্লুইসগেট ইজারা নিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা মাছ চাষ করায় বন্যার সময়ও সময়মতো গেট খোলা হয় না।
স্থানীয় বাসিন্দা আজিজ উদ্দিন বলেন, “সময়ে গেট খুললে এতদিন পানি আটকে থাকত না। মানুষের দুর্ভোগও অনেক কম হতো।”
আরেক বাসিন্দা আনিসুর রহমান বলেন, “কিছু মানুষের মাছ রক্ষার জন্য হাজার হাজার মানুষকে কষ্ট করতে হচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করা উচিত।”
{“remix_data”:[],”remix_entry_point”:”challenges”,”source_tags”:[],”origin”:”unknown”,”total_draw_time”:0,”total_draw_actions”:0,”layers_used”:0,”brushes_used”:0,”photos_added”:0,”total_editor_actions”:{},”tools_used”:{},”is_sticker”:false,”edited_since_last_sticker_save”:false,”containsFTESticker”:false}
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম বলেন, “বান্দরবান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় চকরিয়া ও পেকুয়ার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানির উচ্চতা বেশি থাকায় স্লুইসগেট খুললেও পানি বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। নদীর পানি কমে গেলে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হবে।”
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, “বন্যাকবলিত সব ইউনিয়নের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে। যেসব দুর্গম এলাকায় এখনো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, সেখানে নৌকার মাধ্যমে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তার বাইরে রাখা হবে না।”
জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গত মানুষের জন্য সরকারিভাবে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে কাজ চলছে।”
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।