প্রেস বিজ্ঞপ্তি :
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও ১০টি সংসদীয় আসনের রিটার্নিং অফিসার মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা হুঁশিয়ার করে বলেছেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলার পরিকল্পনাকারীদের আর সতর্ক করা হবে না, সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “আজই আমরা শেষবারের মতো সতর্ক করে দিচ্ছি। নির্বাচনের দিন কেউ যদি কোনো কেন্দ্রে ঝামেলা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, তাকে সতর্ক করার আর কোনো সুযোগ থাকবে না। শুধু ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে আজ শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারী) চট্টগ্রাম জেলার কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ ও মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
জেলা প্রশাসক বলেন, এই নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনের অবস্থান একেবারেই পরিষ্কার—“নো ড্রামা, নো লবিং—এটাই আমাদের অবস্থান। আবারও বলছি, নো ড্রামা।” এভাবেই শেষবারের মতো সবাইকে সতর্ক করে দেন তিনি।
ডিসি জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সরকার থেকে নিবিড়ভাবে মনিটরিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে,“আমরা প্রত্যেককে মনিটর করছি। আমাকে যেমন রিটার্নিং অফিসার হিসেবে প্রতিনিয়ত মনিটর করা হচ্ছে, ঠিক তেমনি আপনাদের প্রতিটা কার্যক্রমও মনিটর করা হচ্ছে। সুতরাং কোনো ধরনের চালাকি বা অসততার আশ্রয় নেবেন না—প্লিজ। কারণ তাহলে আপনি সমস্যায় পড়বেন।”
প্রিজাইডিং অফিসারদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,“আপনাকে আইন অনুযায়ী কাজ করতে হবে। আইনের বাইরে যাওয়ার বা তাকানোর কোনো সুযোগ নেই।”
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন,“আমরা প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছি। আনসার বাহিনীর সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে মোবাইল ব্যবহারের মাধ্যমে কেন্দ্র মনিটরিং করা হবে। পুলিশের বডি-অন ক্যামেরা রয়েছে। সেনাবাহিনী ও বিজিবিও বডি-অন ক্যামেরার আওতায় এসেছে। প্রতিটি কেন্দ্র সেন্ট্রালি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। সুতরাং কোনো নাটক করার সুযোগ নেই, কোনো ড্রামার সুযোগ নেই—সবকিছুই মনিটর করা হবে।”
তিনি বলেন,“কেউ যদি মনে করেন—‘আমাকে তো কেউ দেখছে না’, তাহলে তিনি ভুল করছেন। তিনি অন্ধকারে আছেন। অনুগ্রহ করে অন্ধকার থেকে বের হয়ে আসুন।”
নিজ নিজ সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ভোটকেন্দ্রে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, “আপনার সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন। মনে রাখবেন—আপনি এমন একটি বাংলাদেশ নির্মাণে অংশ নিচ্ছেন, যেখানে আপনার সন্তান বড় হবে। এই মাঠে অনেকে জিতবে, অনেকে হারবে। কিন্তু আমরা যারা মাঠে নেমেছি, আমরা বাংলাদেশকে জেতাতে নেমেছি—কোনো ব্যক্তি বা দলকে নয়।”
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নিরন্তর প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,“আমরা সপ্তাহের কোনো দিন দেখছি না—শুক্রবার, শনিবার, ছুটির দিন, সকাল, সন্ধ্যা, রাত—নির্বাচনকে একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নিতে আমরা মাঠে আছি।”
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন,“এই নির্বাচনে বাংলাদেশের সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, আনসার—তাদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছে। সুতরাং আপনার দায়িত্বের গুরুত্ব ও ব্যাপ্তি আপনাকে অনুধাবন করতে হবে।”
তিনি বলেন,“জেলা ও বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে মনিটরিং ডিভাইস স্থাপন করা হয়েছে। কিছুই লুকানোর সুযোগ নেই—সবকিছুই স্বচ্ছ।”
জাতির প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, “এই জাতির অনেক স্বপ্ন, অনেক প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণে কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না। দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলার সুযোগ নেই। যেমনভাবে আমাকে মনিটর করা হচ্ছে, তেমনি আপনাদের সবাইকেই মনিটর করা হচ্ছে। কারও দায়িত্ব পালনে ব্যত্যয় ঘটলে তার দায় সরকার বা নির্বাচন কমিশন নেবে না। আবারও বলছি—I mean it।”
তিনি বলেন, “আমরা চাই না আপনাদের প্রতি কঠোর হতে। আমরা চাই না আপনারা কোনো ধরনের ভোগান্তিতে পড়ুন। কিন্তু আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতেই হবে।”
সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “অনেকে নানা আশঙ্কার কথা বলেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে—আমাদের শরীরে যে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, সেটিই সেই রক্ত, যার বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখানো মানুষদের সংখ্যা কম ছিল, কিন্তু দেশপ্রেমে কোনো সংশয় ছিল না। তাহলে আমাদের মধ্যে এত সংশয় কেন? কিসের ভয়?”
নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন,“আপনি এই সমাজে বসবাস করেন, বিভিন্ন অংশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে, রাজনৈতিক দলের প্রতি ব্যক্তিগত ভালোবাসাও থাকতে পারে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই ভালোবাসার কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর সুযোগ নেই। দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকেই আপনাকে প্রমাণ করতে হবে—আপনার ভালোবাসা রাষ্ট্রের প্রতি।”
তিনি বলেন,“দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মচারীদের গায়ে যে কালিমা লেগেছে, সেই কালিমা মুছে ফেলার সময় এসেছে। এবারই সেই সুযোগ।” সবার উদ্দেশে তিনি বলেন,“আপনার যদি এখনো কোনো সংশয় থাকে, দয়া করে তা ঝেড়ে ফেলুন। সরকার যে সুযোগ দিয়েছে, সেটিকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি বরদাশত করা হবে না।”
এলাকায় কোনো ভয় বা আতঙ্ক থাকলে জানানোর আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন,“আমাদের জানান, আমরা ব্যবস্থা নেব। কিন্তু সীমাবদ্ধতার দোহাই দেওয়ার সুযোগ নেই।”
তিনি বলেন,“আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে আমার সন্তান কারও গোলাম হবে না। আমরা সরকারি কর্মচারীরা কারও ব্যক্তিগত গোলাম হব না—আমরা রাষ্ট্রের গোলাম হতে চাই। ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রই হবে আমাদের সর্বোচ্চ পরিচয়।”
শেষে তিনি বলেন,“আপনারা সবাই বিবেকবান মানুষ। বিবেক বিক্রি করবেন না, মেরুদণ্ড ভাঙবেন না।”
আনোয়ারা উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার এবং কর্ণফুলী উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা সজীব কান্তি রুদ্রের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন সরকার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী হাসান, উপ-পরিচালক (স্থানীয় সরকার) গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান, সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বশির আহমেদ এবং আনসার ও ভিডিপির পরিচালক ও জেলা কমান্ড্যান্ট (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোহাম্মদ মোস্তাক আহমদ।












