তারেকুর রহমান, কক্সবাজার :
কয়েকদিন আগেই শেষ হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদের ছুটির আমেজ কাটতে না কাটতেই স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। পর্যটকদের পদচারণায় এখন মুখর সৈকত এলাকা, আর এতে নতুন করে স্বস্তি ফিরেছে পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের মধ্যে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সৈকতের কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টসহ প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পর্যটকদের ভিড়। কেউ হাঁটু কিংবা বুকসমান পানিতে নেমে ঢেউয়ের সঙ্গে দুলে দুলে সমুদ্রস্নানে ব্যস্ত, কেউ আবার টায়ারে ভেসে সমুদ্রের পানিতে আনন্দ নিচ্ছেন। অনেকে জেটস্কিতে করে সৈকতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রাইড করছেন, আবার কেউ বিচবাইক কিংবা ঘোড়ায় চড়ে উপভোগ করছেন সমুদ্রপাড়ের সৌন্দর্য।

এদিকে অনেক পর্যটক প্রিয়জনের হাত ধরে সমুদ্রের নোনা জলে পা ভিজিয়ে স্মৃতির মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ছোট ছোট শিশুরা ভেজা বালু দিয়ে বানাচ্ছে কল্পনার রাজপ্রাসাদ। রং-বেরঙের বেলুন ও খেলনার প্রতি তাদের আগ্রহও চোখে পড়ার মতো। এসব আবদার পূরণে ব্যস্ত দেখা গেছে বাবা-মা কিংবা অভিভাবকদের।
কক্সবাজার শহরের সমুদ্রসৈকত ছাড়াও প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ব্যবহার করে পর্যটকদের ভিড় দেখা গেছে ইনানী, হিমছড়ি, পাটোয়ারটেক, শামলাপুর ও টেকনাফ জিরো পয়েন্ট এলাকায়। এছাড়াও রামুর বৌদ্ধমন্দির এবং মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরেও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদের ছুটির পর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আবারও পর্যটকরা ছুটে আসতে শুরু করেছেন কক্সবাজারে। বিশেষ করে ঢাকা, কুমিল্লা ও রাজশাহী থেকে আসা পর্যটকদের সংখ্যা বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সোলাইমান তালুকদার বলেন, “ঈদের পর একটু ফাঁকা সময় পেয়েছি, তাই পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে চলে এসেছি। স্বাধীনতা দিবসে সমুদ্রের পাশে দাঁড়ানোর অনুভূতি আলাদা। এখানে এসে খুব ভালো লাগছে।”
কুমিল্লা থেকে আসা আরেক পর্যটক রাজন হোসাইন বলেন, “সৈকতে এখন ভিড় থাকলেও পরিবেশটা খুব সুন্দর। বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরতে ভালো লাগছে। হোটেলগুলোতেও মোটামুটি সুবিধা পাচ্ছি।”
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুফাইদা তাজরিন বলেন, “ ঈদের পরদিন কক্সবাজার আসার পরিকল্পনা থাকলেও অতিরিক্তের ভিড় হবে ভেবে কয়েকদিন পরে আসলাম। সঙ্গে মা বাবা ভাই বোনসহ পুরো পরিবারের এসেছি। এই সময়ে পরিবারের সঙ্গে সমুদ্র পাড়ে কাটানো মুহূর্তগুলো অন্যরকম অনুভূতি দিচ্ছে। পরিবেশটা এখন অনেক প্রাণবন্ত লাগছে।”
সৈকতে পর্যটকদের ভিড় বাড়ায় কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে পর্যটনসেবি ব্যক্তিদের মধ্যেও।
জেটস্কি চালক মো. আব্দুল্লাহ বলেন, “ঈদের পর স্বাধীনতা দিবসকে ঘিরে আবারো পর্যটক বেড়েছে। আজ সকাল থেকেই অনেকেই জেটস্কি চালাতে আসছেন। তাদের মনের মতো করে সেবা দেওয়া হচ্ছে।”
বিচবাইক চালক ফারুক বলেন, “পর্যটক বেশি থাকলে আমাদেরও কাজ বাড়ে। আজ সকাল থেকে বেশ ভালো আয় হচ্ছে। পর্যটকদের হয়রানি না করে। সঠিক নিয়মে দর কষাকষির মাধ্যমে বিচ বাইকে চড়ানো হচ্ছে।”
ঘোড়া মালিক ইসমাইল বলেন, “পর্যটক বেশি হলে ঘোড়ার রাইডও বেশি হয়। ঈদের পরে আবারও ভালো সময় যাচ্ছে।”
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, “ঈদকে কেন্দ্র করে এবার কিছুটা ব্যবসা হয়েছে। যদি এভাবে ঈদের পর আরও ১০ দিন পর্যটক থাকে, তাহলে পর্যটন খাতে বাণিজ্য শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।”
পর্যটকদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সি সেইফ লাইফ গার্ডের সিনিয়র সদস্য জয়নুল আবেদীন ভুট্টো বলেন, “পর্যটক বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সতর্কতা আরও বাড়িয়েছি। সাগরে নামার আগে সবাইকে নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।”
সি সেইফ লাইফ গার্ডের ফিল্ড টিম লিডার ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, “আমাদের টিম সকাল থেকেই সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে কাজ করছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।”
ইনানী সৈকতে কর্মরত বিচকর্মী বেলাল উদ্দিন বলেন, “পর্যটক বেশি থাকলে সৈকতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজও বেড়ে যায়। ইনানী, পাটোয়ারটেকসহ সৈকতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তায় আমরা সার্বক্ষণিক কাজ করছি।”
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক পারভেজ আহমেদ বলেন, “সৈকত এলাকায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পর্যটকরা যাতে নিরাপদে ঘুরতে পারেন, সে বিষয়টি আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।”
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, “পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশও সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে সমুদ্রসৈকত সংলগ্ন এলাকায় জেলা পুলিশের টিম ও বিভিন্ন সাদা পোশাকের টহল দল সক্রিয় রয়েছে।”
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে। পর্যটকরা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটাতে পারেন, সে জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”












